বাংলাদেশ কি বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য হবে, নাকি অনিশ্চয়তায় থমকে যাবে অর্থনীতি?

ইনসাইডার ডিস্ক, ১১ মে, ২০২৬

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি নিজেকে বৈশ্বিক পুঁজি আকর্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, নাকি নীতিগত অনিশ্চয়তা ও জটিলতা অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করবে?
দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় বলেছেন, বহু দশক ধরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশ স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে হাজারো উদ্যোক্তা তৈরি করেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ শত বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও মূলধন প্রবাহে ভূমিকা রাখছে। একইভাবে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
তবে এত কিছুর পরও বাংলাদেশের বার্ষিক বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচে অবস্থান করছে, যা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী অর্থনীতির তুলনায় অনেক কম। লেখকের মতে, এর মূল কারণ বাজার বা জনসংখ্যা নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট।
তিনি বলেন, বড় বিনিয়োগকারীরা আবেগ দিয়ে নয়, বরং নীতির স্থিতিশীলতা, কর কাঠামো, মূলধন স্থানান্তরের স্বাধীনতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকারিতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়।
লেখায় টেলিযোগাযোগ খাতের উদাহরণ টেনে বলা হয়, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এই খাতকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের বদলে স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। ফলে আইসিএক্স, আইআইজি, এনটিটিএন, টাওয়ারকোসহ বিভিন্ন মধ্যবর্তী লাইসেন্সিং কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা খাতটিকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
এছাড়া টেলিকম, ব্যাংকিং, বীমা ও আর্থিক খাতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কর আরোপের সমালোচনা করা হয়েছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত মোবাইল অপারেটরদের করহার ৪০ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্তদের জন্য ৪৫ শতাংশ, যেখানে আঞ্চলিক গড় প্রায় ২৬ শতাংশ। মোবাইল গ্রাহকদের ওপর প্রায় ৩৯ শতাংশ পরোক্ষ কর আরোপ করা হয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রামীণফোন সিইওর মতে, এই ধরনের উচ্চ কর বিনিয়োগ ও পুনঃবিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব বাড়ানোর বদলে দীর্ঘমেয়াদে করভিত্তি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে বৈষম্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। মোবাইল অপারেটররা কঠোর কর ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় থাকলেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতারা তুলনামূলক কম কর সুবিধা পাচ্ছে। এতে একই ধরনের সেবার ক্ষেত্রে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিটিআরসির সঙ্গে গ্রামীণফোনের দীর্ঘদিনের অডিট বিরোধকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছে, দীর্ঘসূত্রতা, রেট্রোস্পেকটিভ ব্যাখ্যা এবং অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা তৈরি করে।
লেখায় আরও উল্লেখ করা হয়, গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন বাংলাদেশ ও সানোফি বাংলাদেশের মতো বহুজাতিক কোম্পানির বাজার ছাড়াও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে স্থিতিশীল নীতি, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, মুনাফা দেশে পাঠানোর নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, বাংলাদেশে সম্ভাবনার ঘাটতি নেই। এখন প্রয়োজন আস্থা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা। কারণ বৈশ্বিক পুঁজি সবসময় স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতার দিকেই যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.