দাদা তপনের উত্থান-পতনের রক্তাক্ত অধ্যায়

ইনসাইডার ডিস্ক, ১৬ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একসময় এমন এক নাম ছিল, যার উচ্চারণেই সাধারণ মানুষের মনে নেমে আসত আতঙ্কের ছায়া। সেই নাম—আব্দুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপন। খুন, চাঁদাবাজি, বোমাবাজি ও সশস্ত্র আধিপত্যের মাধ্যমে গোটা অঞ্চলে বিভীষিকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)।২০০৮ সালের ১৮ জুন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামে র‌্যাবের অভিযানে নিহত হন দাদা তপন। তার সঙ্গে নিহত হয় নারী ক্যাডার রিক্তা। সেদিনই শেষ হয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক ভয়ংকর অধ্যায়ের।মাদ্রাসা ছাত্র থেকে চরমপন্থি নেতাঝিনাইদহ সদর উপজেলার পশ্চিম বিষয়খালী গ্রামের ইবাদত হোসেন মালিথার ছেলে তপনের শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। একসময় তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন এবং খণ্ডকালীন ইমামতিও করেছেন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে তিনি জড়িয়ে পড়েন চরমপন্থি রাজনীতিতে। পরে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন জনযুদ্ধের প্রধান সংগঠক ও ভয়ংকর সামরিক নেতা।পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তপনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাহিনী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নির্বিচারে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও বোমা হামলা চালাত। রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—কেউই ছিল না তাদের ভয়াল তৎপরতার বাইরে।রক্তাক্ত আধিপত্যের বিস্তার২০০০ সালের পর পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির বিভক্তির মধ্য দিয়ে গঠিত হয় এমএল-জনযুদ্ধ। তপনের নেতৃত্বাধীন এই সংগঠন দ্রুতই সামরিক শক্তি ও ভয়াবহতার দিক থেকে শীর্ষে উঠে আসে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যায় জনযুদ্ধ বাহিনী। প্রতিপক্ষকে গলাকেটে হত্যা, বোমা হামলা ও প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার ঘটনায় পুরো অঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে। গ্রামাঞ্চলের হতদরিদ্র, বঞ্চিত ও প্রতিশোধপরায়ণ কিছু যুবকও বিভিন্ন কারণে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।র‌্যাবের অভিযানে সমাপ্তি২০০৮ সালের জুনে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে সুমন নামে এক সহযোগী। তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল সিমের সূত্র ধরে তপনের অবস্থান নিশ্চিত হয়। পরে র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-৬ যৌথ অভিযান চালায় কুষ্টিয়ার বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামে।ভোরের আলো ফোটার আগেই চারদিক ঘিরে ফেলে র‌্যাবের সদস্যরা। অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন দাদা তপন ও তার নারী সহযোগী রিক্তা। ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল তার প্রিয় একে-৪৭ রাইফেল।তপনের মৃত্যুর পর একে একে নিহত হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ছোট ভাই আকাশ, টিক্কা ও একদিল। এর মধ্য দিয়ে কার্যত ভেঙে পড়ে জনযুদ্ধের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক।চরমপন্থার উত্থান ও বিভক্তির ইতিহাসবাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থি সংগঠনগুলোর উত্থান শুরু হয় মূলত সত্তর ও আশির দশকে। শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সংগঠন আদর্শচ্যুত হয়ে পড়ে।পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বহারা পার্টি, গণমুক্তি ফৌজসহ বিভিন্ন সংগঠন পরে অসংখ্য উপদলে বিভক্ত হয়। আদর্শের পরিবর্তে আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি ও ঘের দখলই হয়ে ওঠে তাদের মূল লক্ষ্য।মোফাখখার চৌধুরী, মধুবাবু, টিপু বিশ্বাস, দীলিপ, মৃণাল, রাকেশ কামাল, তপুসহ একের পর এক আঞ্চলিক গ্যাংলিডারের উত্থান ঘটে। পরে বন্দুকযুদ্ধ, দলীয় কোন্দল কিংবা প্রতিপক্ষের হামলায় তাদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়।এখন শুধুই অতীতের গল্পএকসময় যাদের নাম শুনে মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে দিত, সেইসব চরমপন্থি নেতাদের অস্তিত্ব এখন প্রায় ইতিহাস। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রক্তাক্ত জনপদ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে দাদা তপন ও তার বাহিনীর কাহিনি এখন অনেকটাই রূপকথার মতো শোনায়—তবে সেই রূপকথা ছিল ভয়, রক্ত আর বিভীষিকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.