ইনসাইডার ডিস্ক, ০৬ জুন, ২০২৬

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া অধিকাংশ প্রধান মুখদের নিয়র জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি বা সংক্ষেপে এনসিপি। অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দলটি নিজেদেরকে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে অভ্যুত্থানের একদম শুরু থেকে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলা সরকার কি এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে পারবে?
প্রয়াত রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহিদ শরীফ ওসমান হাদি একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন, এনসিপির কিছু নেতাকর্মী কীভাবে অল্প কয়েক মাসের ব্যবধানে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে উঠলেন। তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল এবং দলটির নেতাদের আকস্মিক আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে।
এরই মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী নিজাম উদ্দিন-এর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আন্দোলন দমাতে অর্থ দাবির অভিযোগ সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একইসঙ্গে গত জুলাইয়ে এক নারীর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ (প্রায় ২ কোটি টাকা) দাবি এবং অর্থ না দেওয়ায় তার স্বামীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও আইনি অবস্থানও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দিলশাদ আফরিন-কে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
এছাড়া সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের এক ব্যক্তিগত সহকারীর বিরুদ্ধে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার খবরও আলোচনায় এসেছে। যদিও অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না, তবু ঘটনাগুলো জনমনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
সাবেক গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান বিএনপি নেতা রাশেদ খান সম্প্রতি দলটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে : নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর সরাসরি আওয়ামী লীগের সম্পত্তি দখল, এক নারীকে চাকরি দেওয়ার নামে সারজিস আলমের ২৮ লক্ষ টাকা দাবি এবং সাংগঠনিক অনিয়মের বিষয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও তদন্তের দায়িত্ব অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার।
সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বেশ কিছু গাফিলতি ও ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হয়েছে। সরকারি দল বিএনপি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই ব্যর্থতার পেছনে ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বেশ কিছু ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করেছে।
যার মধ্যে রয়েছে টিকা সংগ্রহ ও অর্থায়নে পরিবর্তন। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্টরা টিকা কেনার পদ্ধতি ও অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বারবার সতর্কবার্তা ও চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
এছাড়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। আগে নির্ধারিত একটি সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল, যা সরকারের পক্ষ থেকে পিছিয়ে ২০২৫ সালে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তা পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়।
ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে টিকা ক্রয়নীতি না বদলানোর জন্য সরাসরি অনুরোধ জানালেও তা অগ্রাহ্য করা হয়। এর ফলে দেশে টিকার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্তদের বড় একটি অংশই (৭৪%) টিকার কোনো ডোজ গ্রহণ করেনি।
দল গঠনের শুরুতেই একজন নেতার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে এনসিপিকে ঘিরে নানা ধরনের সমালোচনাও তৈরি হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মেডিকেল দলের সদস্য বর্তমান স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবীকে নিয়েও মন্ত্রণালয়ে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়াও সচিবালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য কিংবা চাঁদাবাজির মতো অভিযোগও উঠছে এনসিপির কোন কোন নেতার বিরুদ্ধে।
ভয়াবহ অভিযোগ তুলে চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটি থেকে একযোগে ২২ জন নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছেন।
এদিকে এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার জীবনযাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। সমালোচকদের দাবি, অল্প সময়ের ব্যবধানে কয়েকজন নেতার জীবনধারা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যবহৃত প্রযুক্তিপণ্য ও যানবাহনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের আর্থিক উৎস সন্দহজনক বলে মনে করেন তারা।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদসহ কয়েকজন নেতার বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও সম্পদের উৎস সম্পর্কে। অনেকেই জানতে চাচ্ছেন, তাদের ব্যবহৃত দামি ব্র্যান্ডের পোশাক, সর্বাধুনিক স্মার্টফোন ও উচ্চমূল্যের যানবাহনের অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে।
যেখানে ২৪ সালের অভ্যুত্থানের আগেও তারা চলাচেরা করতেন পাবলিক ট্রান্সপোর্টে, ঢাকা শহরে ভাড়া থাকতেন এক কামরার মেস বাসায়। উল্লেখ্য, গণঅভ্যুত্থানের পর একটি গণমাধ্যমে হান্নান মাসুদ জানিয়েছিলেন হাতিয়ার সবচেয়ে ভাঙা ঘরটি তাদের।
এছাড়া হান্নান মাসউদ বা হাসনাত আব্দুল্লাহ এর মতো এনসিপি নেতারা কোন অধিকার বা ক্ষমতাবলে একটা নির্দিষ্ট এলাকার উন্নয়নের কথা বলে কোটি কোটি টাকা ইন্টারিম সরকার থেকে নিয়ে যায়-এটাও প্রশ্ন অনেকের।
যদিও এসব প্রশ্নের অনেকগুলোই কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো সামনে আসেনি, তবুও বিষয়গুলো জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বলা বর্তমান সরকার কি রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে? নাকি অভিযোগগুলো কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবেই থেকে যাবে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা দল আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। অভিযোগ যদি মিথ্যা হয়, তবে তা তদন্তের মাধ্যমে খণ্ডিত হওয়া উচিত; আর যদি সত্য হয়, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। জনগণ এখন সেই জবাবদিহিতাই দেখতে চায়।