বিবিএস জরিপে দেশের জনপ্রিয় ১০ পর্যটন স্পট

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। পাহাড়, সমুদ্র, হাওর-বাঁওড় থেকে শুরু করে প্রাচীন স্থাপত্য—সবই মিলে এ দেশের পর্যটন খাতকে করেছে সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট চিহ্নিত করেছে, যা ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত। এসব স্পট শুধু বিনোদনের স্থান নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিবিএস জরিপে দেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের তালিকার প্রথম দশটি হলো—

কক্সবাজার
তালিকার প্রথমেই আছে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রাকৃতিক বালুর সৈকত (১২০ কিলোমিটার) কক্সবাজারের কথা। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত এটি। দেশের পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ভ্রমণ করে সমুদ্রতীরবর্তী শহরটিতে। কক্সবাজারকে এ কারণে ‘পর্যটন রাজধানী’ও বলা হয়। টেকনাফ-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। এ ছাড়া কক্সবাজারে আছে প্যারাসেলিং, ঝিনুক মার্কেট, বার্মিজ মার্কেট, শুঁটকিপল্লী, ফিশ অ্যাকোয়ারিয়াম, বিলাসবহুল হোটেলসহ নানা পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র। রেললাইন হওয়ায় শহরটিতে পর্যটকদের আনাগোনা আরো বেড়েছে।

পতেঙ্গা
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গা। শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই সমুদ্রসৈকত দেখতে আসে বহু পর্যটক। এটি কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। চট্টগ্রাম বন্দরে অপেক্ষমাণ সারি সারি ছোট-বড় জাহাজ রাতের আঁধারে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করে। সাগরের বুকে অস্তমিত সূর্যের ম্রিয়মাণ আলোর রূপ দেখতে কিংবা বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে ছুটে যান চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে। সিমেন্ট দিয়ে সৈকতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কারণে আগের চেয়ে জায়গাটির প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বেড়েছে।

কুয়াকাটা
পর্যটকদের কাছে পছন্দের তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে সাগরকন্যা খ্যাত পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সমুদ্রসৈকতের কুয়াকাটা দেশের অন্যতম নৈসর্গিক স্থান। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের জন্য দেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত এটি। পাশেই রয়েছে সুবিশাল নারকেলবাগান। সৈকতের সাত কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে শুঁটকিপল্লী। তাজা মাছ কেটে শুঁটকি করা দেখতেও পর্যটকরা ভিড় করে সেখানে। শীতকালে বিভিন্ন অতিথি পাখির আগমনে কুয়াকাটা আরো নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে।

শ্রীমঙ্গল
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল দিন দিন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে উঠছে। মৌলভীবাজারের উপজেলাটির প্রায় ৪৪ শতাংশ জায়গাজুড়েই চা-বাগান। সবুজ চা-বাগানের পাশাপাশি অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান যেমন আছে, তেমনি গড়ে উঠেছে পাঁচতারা হোটেলসহ বহু মানসম্পন্ন রিসোর্ট। পরিবার-পরিজন নিয়ে দু-তিন দিন নিরিবিলিতে চা-বাগানের সান্নিধ্যে থাকার জন্য চমত্কার জায়গা। বাইক্কা বিল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং জলপ্রপাতের জন্য বছরজুড়ে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে শ্রীমঙ্গল।

বান্দরবান
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলার এটি একটি। মনোরম নৈসর্গিক দৃশ্য এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বান্দরবান ঠিক যেন ছবির মতো। মেঘ জমে থাকা পাহাড়চূড়া আর ঝুরি ঝরনার প্রশান্ত সৌন্দর্যে ডুব দিতে বছরজুড়েই বান্দরবানে যায় পর্যটকরা। নীলগিরি, কেওক্রাডং, বগা লেক, নাফাখুম, নীলাচল, চিম্বুক, তিন্দু, লামা, দেবতাখুম, মারায়ন তংসহ এখানে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গও এই জেলায়।

সাজেক ভ্যালি
মেঘ, পাহাড় আর সবুজের অপার সৌন্দর্যে ঘেরা প্রকৃতির এক লীলাভূমি সাজেক। এর অবস্থান রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় হলেও যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক হাজার ৮০০ ফুট ওপরে এর অবস্থান। পাহাড়ের চূড়ায় থোকায় থোকায় ভেসে থাকা সাদা মেঘ সাজেককে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। পর্যটকদের অনেকেই সাজেককে বাংলার ভূস্বর্গ বলে অভিহিত করে। সকাল-বিকাল রং বদলায় এখানে। শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে সেখানে। সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়ার নাম কংলাক। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়নও এটি। আয়তন ৭০২ বর্গমাইল।

সোনারগাঁ
বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান এটি। এই স্থানের প্রাচীন নাম সুবর্ণগ্রাম। প্রাচীন যুগে এটি ছিল বঙ্গ বা সমতট রাজ্যের রাজধানী। মধ্যযুগে এটি বন্দরনগরী হিসেবে গড়ে ওঠে। এখানকার তৈরি মসলিনের খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এর অবস্থান। পরিখা, লেকসহ বহু প্রাচীন স্থাপনার নিদর্শন রয়েছে সোনারগাঁয়ে। এটি নারায়ণগঞ্জ জেলার দর্শনীয় স্থান। বাংলাদেশের লোকশিল্পের সংরক্ষণ, বিকাশ ও সর্বসাধারণের মধ্যে লোকশিল্পের গৌরবময় দিক তুলে ধরার জন্য ১৯৭৫ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে সরকার। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পীদের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী প্রায় পাঁচ হাজার নিদর্শন।

রাঙামাটি
বাংলাদেশের বৃহত্তম এই জেলা যেন প্রকৃতির আরেক লীলাভূমি। কাপ্তাই হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু, রাজবন বিহারসহ জেলা সদরের বিভিন্ন স্থানে বছরজুড়েই ভ্রমণ করে পর্যটকরা। এ জেলায় রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম হ্রদ কাপ্তাই এবং বৃহত্তম জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র। ১০টি ভাষাভাষীর ১১টি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির দেখা মেলে এখানে। কাপ্তাই লেকের মধ্যে ছোট ছোট রিসোর্ট গড়ে ওঠায় জায়গাটি পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

সুন্দরবন
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এটি। বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশজুড়ে এর অবস্থান। চিত্রা হরিণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে সুপরিচিত সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর একটি। সুন্দরবনের সৌন্দর্য প্রকৃতি ও প্রাণীপ্রেমী মানুষকে আকর্ষণ করে। সমুদ্রতীরবর্তী ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন দেখতে পর্যটকরা ছুটে যায়। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বহু রিসোর্ট।

জাতীয় চিড়িয়াখানা
ঢাকার মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা রয়েছে পর্যটকদের আনাগোনার দশম স্থানে। বছরে প্রায় ৩০ লাখ দর্শনার্থী এই চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করে থাকে। বাঘ, ভালুক, হাতি, সিংহ, কুমির, জিরাফ, গণ্ডার, অজগরসহ নানা পশুপাখি দেখার জন্য বছরজুড়ে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে এখানে। দুটি লেকসহ ১৮৬ একরের এই চিড়িয়াখানায় ১৩৫টি প্রজাতির প্রায় তিন হাজারের বেশি পশুপাখি আছে। এখানকার প্রাণী জাদুঘরে রয়েছে শতাধিক প্রজাতির স্টাফিং করা পশুপাখি। ফিশ অ্যাকোয়ারিয়ামে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এখানকার প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশও মুগ্ধ করে পর্যটকদের।

বিবিএস জরিপে উঠে আসা এসব জনপ্রিয় পর্যটন স্পট বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী বৈচিত্র্যের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। এগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে যেমন ভ্রমণ আনন্দ বাড়ায়, তেমনি দেশের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকেও তুলে ধরে। সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এসব পর্যটন স্পট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক পরিচিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog