টেকনোসার্ভ কর্তৃক বাস্তবায়িত এবং গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত মিলার্স ফর নিউট্রিশন কোয়ালিশনের উদ্যোগে বাংলাদেশে ফর্টিফাইড আটার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, ব্যবহার ও পুষ্টিগত প্রভাব পর্যালোচনার লক্ষ্যে শীর্ষস্থানীয় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি ২০২৬) ঢাকার গুলশানে অবস্থিত লেকশোর হাইটস হোটেলে কর্মশালাটি আয়োজিত হয়।
কর্মশালায় বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্পে ফর্টিফাইড আটার বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং এর পুষ্টিগত প্রভাব নিয়ে বিদ্যমান সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ সুযোগসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শীর্ষস্থানীয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্রস্তুতকারক, ফ্লাওয়ার মিল মালিক, আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তি সরবরাহকারী, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
এই কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ফর্টিফাইড আটা কীভাবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্পে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে একদিকে অপুষ্টি সমস্যা মোকাবিলা করা যায় এবং অন্যদিকে দেশীয় বাজার ও রপ্তানি শিল্পে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব সে বিষয়টি শিল্পখাতের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
কর্মশালায় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়, যা পুষ্টিসমৃদ্ধ উদ্ভাবনী খাদ্যপণ্যের প্রতি বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের প্রতিফলন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল এসিআই ফুডস্, ইফাদ মাল্টি প্রডাক্টস লি:, আকিজ এসেনশিয়াল লিমিটেড, আকিজ এফএমসিজি লিমিটেড, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাঃ, আমান গ্রপ অব ইন্ডাঃ কুপারস, গোল্ডেন হারভেস্ট, জনতা বিস্কুট কোম্পানি, ড্যান ফুড, ইউরো ফুড, রূপসি বিডি গ্রুপ, প্রাণ গ্রুপ, কিউএএম (কেএফসি ও পিজ্জা হাট), ইগলু আইসক্রিম এন্ড মিল্ক ইন্ডাঃ, মীম শরত গ্রুপ, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লি:, গ্রামীন ডানোন, ইউরেশিয়া ফুড লিঃসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে বিস্কুট, বেকারি, দুগ্ধজাত খাদ্য, স্ন্যাকস, নুডলস এবং রেডি-টু-ইট পণ্য উৎপাদনে ফর্টিফাইড আটা ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্প এখন বাস্তবিকভাবেই প্রস্তুত।
উদ্বোধনী অধিবেশনে টেকনোসার্ভের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. গুলজার আহমেদ বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্প হচ্ছে জনগণের কাছে অপরিহার্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর ও সহজ সম্প্রসারণযোগ্য মাধ্যম।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফর্টিফাইড আটা ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালু ও বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে জাতীয় পুষ্টি লক্ষ্য অর্জনেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে—যা শিল্পখাতের জন্য একটি দ্বিমুখী সুফল।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ গুলজারুল আজিজ এবং টেকনোসার্ভ-এর সিনিয়র ফুড ফর্টিফিকেশন স্পেশালিস্ট মোঃ নাঈম জোবায়ের।
“পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?” শীর্ষক একটি সঞ্চালিত আলোচনায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), গেইন (GAIN) এবং নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল (NI)-এর মতো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পাশাপাশি বিএএসএফ, বুলার বাংলাদেশ-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় জাতীয় পর্যায়ে ফর্টিফাইড আটা সম্প্রসারণে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সরবরাহ শৃঙ্খলার সমন্বয় এবং কার্যকর অংশীদারিত্ব কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত উপস্থাপন করা হয়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক জনাব রেজা মোহাম্মদ মহসিন। তিনি বলেন, “এটি একটি সময়োপযোগী উদ্ভাবন। বর্তমানে ফর্টিফাইড আটা বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে এটি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।” তিনি ভোক্তা পর্যায়ে ফর্টিফাইড খাদ্যপণ্যের দ্রুত বিস্তারের কথা উল্লেখ করে পুষ্টিসংবেদনশীল খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের অগ্রণী ভূমিকার প্রশংসা করেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, খোলা বাজারে ফর্টিফাইড আটার ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও সম্ভাবনাকে সরকার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ এই উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে প্রসারিত করতে যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, তা প্রশংসনীয়।
একই সঙ্গে তিনি ফুড ফর্টিফিকেশন ইকোসিস্টেম জোরদারে টেকনোসার্ভের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব, সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তিনি সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ফর্টিফাইড আটা শুধু একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান নয়, বরং এটি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ ও টেকসই জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্পে ফর্টিফাইড আটার ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে একদিকে যেমন ভোক্তাদের পুষ্টি ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখবে, তেমনি অন্যদিকে খাদ্য শিল্পের গুণগত মান ও বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে টেকনোসার্ভ-এর কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. গুলজার আহমেদ সকল অংশগ্রহণকারীকে ধন্যবাদ জানান এবং বাংলাদেশে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক খাদ্য ফর্টিফিকেশন সম্প্রসারণে শিল্প, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
মিলার্স ফর নিউট্রিশন কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে স্ট্র্যাটেজিক ফর্টিফিকেশন পার্টনার—বিএএসএফ, বায়োঅ্যানালিট, ডিএসএম-ফারমেনিস, মুলেনকেমি ও স্টার্নভিটামিন; আঞ্চলিক সহযোগী—হেক্সাগন নিউট্রিশন, পিরামাল ও সাংকু; এবং ক্রমবর্ধমান স্থানীয় কারিগরি অংশীদারদের সমন্বয়ে। এই অংশীদাররা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও ফর্টিফিকেশনের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক স্থায়িত্বে অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করছে টেকনোসার্ভ, গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে। মিলার, খাদ্য ফর্টিফিকেশন সংশ্লিষ্ট অংশীজনসহ আগ্রহীরা coalition-এ যুক্ত হওয়ার জন্য millersfornutrition.com ওয়েবসাইটে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
