ইনসাইডার ডেস্ক, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২০২০ সালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে। আর সময় নির্ধারিত ছিল চলতি বছরের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পসূত্রে দ্য স্টেট ইনসাইডার জানতে পেরেছে, আর মাত্র দুমাসের কম সময় বাকি থাকলেও মহাসড়কটির কাজের অগ্রগতি একেবারেই অসন্তোষজনক। কাজের ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির অভিযোগে ২১৩ কিলোমিটার রাস্তার মাত্র ১০ থেকে ১৫ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। মহাসড়কটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তি আর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময় ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝড়ে যাচ্ছে প্রাণ।
কাজের সুবিধার্থে প্রকল্পটি একাধিক প্যাকেজে ভাগ করে দেওয়া হলেও অধিকাংশ স্থানেই দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।নরসিংদী, ভৈরব এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-আশুগঞ্জ অংশে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার একপাশে মাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস। সার্ভিস লেনের কাজ অর্ধেক করে ফেলে রাখায় বৃষ্টির দিনে কাদা আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলার রাজ্যে পরিণত হয়েছে এই মহাসড়ক।
কোনো কোনো প্যাকেজে গত এক বছরে অগ্রগতি মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ।
খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সরু হয়ে যাওয়া রাস্তায় প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগেই থাকছে।
সরেজমিনে পরিদর্শনে জানা যায়, রাস্তার বেজ নির্মাণে নির্ধারিত মানের চেয়ে নিম্নমানের ইটের খোয়া এবং স্থানীয় বালু ব্যবহারের অভিযোগটি এলাকায় বিদ্যমান। নির্মাণাধীন এলাকায় সবসময় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী বা সওজ-এর কর্মকর্তাদের উপস্থিতি না থাকায়, ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছামতো প্রাক্কলন না মেনে কাজ করছেন। একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়েছে জমি অধিগ্রহণ। অভিযোগ উঠেছে অনেক প্রকৃত জমির মালিক এখনো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। উল্টো দালাল চক্রের মাধ্যমে ভুয়া স্থাপনা দেখিয়ে সরকারি কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ৬ লেনে (মূল ৪ লেন এবং দুই পাশে ২ লেন সার্ভিস রোড) উন্নীত করার প্রকল্পের কাজ বর্তমানে চলমান। ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ আশানুরূপ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে না। অনেক জায়গায় জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে কাজ থমকে আছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), ভূমি মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে কাজ আটকে আছে বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, কাজের সামগ্রিক অগ্রগতি প্রায় ১০-১৫% এর মতো হবে। প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একাজ শেষ করতে ২০২৮ সাল নাগাদ গড়াতে পারে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ স্থান সরাইল-আশুগঞ্জ। এ ১২ দশমিক ২১ কিলোমিটার রাস্তাতেই থমকে যাচ্ছে সব যানবাহন। ঢাকায় আসা-যাওয়ার পথে এই ১২ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে লেগে যাচ্ছে ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা। যানজটের ভয়ংকর থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও।
অবর্ণনীয় দুর্দশায় পড়ছেন সিলেট বিভাগের সব জেলাসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী যাত্রীরাও। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার অনুমোদিত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নকশা জানার পরও আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক প্রকল্পের সঙ্গে জড়িতদের রহস্যময় ভূমিকার কারণে সৃষ্টি হয়েছে এই দুর্ভোগ।
জানা গেছে, ২০২০ সালে অনুমোদন পাওয়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নকশায় ছিল চার লেন এবং এসএমবিসি ৫.৫ ফুট। তবে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কে ৫০ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার সড়কের নকশায় ছিল চার লেন এবং ৩.৬ ফুট এসএমবিসি।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এ অংশের রাস্তার জন্য প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ খরচ ছিল প্রায় ১১৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র ৫৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এফকন’-এর ভারতীয় কর্মীরা নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশে ফিরে যান। তবে সেবছর নভেম্বরে তারা কাজে ফিরলেও কাজ ছিল কচ্ছপ গতির। এর মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে আরও দুই বছরের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই এই মহাসড়কে চলাচলের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। সড়কের ছোট-বড় গর্তে পানি জমে, শুষ্ক মৌসুমে ওড়ে ধুলা। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, বিকল হচ্ছে গাড়ি। এর বাইরেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদী অংশের মাহমুদাবাদ থেকে মাধবদী পর্যন্ত প্রায় ৫৪ কিলোমিটার অংশে অন্তত ৫০টি স্থানে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাসড়ককে সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করতে এসব স্থানে সংস্কারকাজ চলছে। এর ফলে ধীরগতিতে চলছে যানবাহন, ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।
মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল থাকলেও খানা-খন্দে গাড়ির গতি রোধ করে ডাকাতির ঘটনাও অহরহ ঘটছে। এছাড়া মহাসড়কে দ্রুতগতি, ওভারটেকিং ও বেপরোয়া গাড়ি চলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।
উল্লেখ্য, কাঁচপুর থেকে সিলেট ২০৯ কিলোমিটার রাস্তায় ৬৬টি সেতু এবং ৩০৫টি কার্লভাটসহ প্রকল্প ব্যয় প্রায় ১৭,০০০ কোটি হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজটি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং যেকারণে বাজেটও পরিবর্তিত হতে পারে। এতো ব্যস্ততম এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার কাজ ধীরগতি হওয়ার ফলে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদেরও এ বিষয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই।
এতে সামনের ঈদ যাত্রা ও বর্ষাকালে মহাসড়কটি আরও ভয়াবহ যমদূত হয়ে উঠতে পারে।
অর্ধযুগ ধরে এ ভোগান্তির কারণে সিলেট অঞ্চলে যেতে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে পর্যটকদের। অথচ শ্রীমঙ্গল, জাফলং, ভেলাগঞ্জ, সুনামগঞ্জের তাহেরপুরসহ হাজারো চা বাগান অবস্থিত এ অঞ্চলে। শুধু এ মহাসড়কটি সম্পন্ন হলে পর্যটন শিল্পের নতুন দ্বার খুলে যাবে। ঢাকা থেকে মাত্র আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টায় আসা যাবে শ্রীমঙ্গলসহ অন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলো।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু রাস্তাটি হলে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দেশি-বিদেশি মানুষ বাড়বে। এতে হোটেল-রিসোর্টের মূল্য বাড়বে। হবে কর্মসংস্থান, কমবে বেকারত্ব।
সম্প্রতি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা মহাসড়কের ভোগান্তি ও কাজের ধীরগতি সড়ক মন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর করেন। জবাবে মন্ত্রী কাজটি দ্রুত শেষ করা প্রতিশ্রুতি দিয়েন।
এখন দেখার বিষয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার কতদ্রুত এ ভোগান্তি থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়।