
জ্বালানি খাতে পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর Coal Power Generation Company Bangladesh Limited-এর (সিপিজিসিবিএল) স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক শিবির নেতা রাফে সালমান রিফাত। আর সেই নিয়োগের পর থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, রিফাতের সঙ্গে “সমঝোতা” ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে যোগ্য হলেও কাজ পেত না, আর সমঝোতা হলে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকেও আদালতের রায় উপেক্ষা করে কাজ পাইয়ে দেয়া হতো।সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Yongtai Energy Pte Ltd অভিযোগ করেছে, রাফে সালমান রিফাতের সঙ্গে সমঝোতায় রাজি না হওয়ায় তাদের বৈধ দরপত্র বাতিল করে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত ইন্দোনেশীয় প্রতিষ্ঠান PT Sumber Global Energy Tbk-কে ১০ লাখ টন কয়লা সরবরাহের কাজ দেয়া হয়। যদিও প্রতিষ্ঠানটি এর আগেই অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিল এবং নিম্নমানের কয়লা সরবরাহের অভিযোগে বিভিন্ন দেশে সমালোচিত।ইয়ংতাই এনার্জি গত বছরের আগস্টে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগের সঙ্গে রাফে সালমান রিফাতের পাঠানো কথিত “সমঝোতার প্রস্তাব” সংবলিত WhatsApp বার্তা ও কল রেকর্ডও সংযুক্ত করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, আরএনপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম ভূইয়া তাদের রিফাতের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চাপ দেন, যদিও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রিফাতের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা ছিল না।অভিযোগে আরও বলা হয়, এই পুরো প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয় আইনের স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও সমতা নীতির গুরুতর লঙ্ঘন এবং এতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও যোগসাজশের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।সূত্র জানায়, তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন রিফাত। অভিযোগ রয়েছে, এই ত্রয়ীকে ঘিরেই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা বিদ্যুৎ খাতের বড় বড় কয়লা আমদানি চুক্তিতে প্রভাব বিস্তার করত।উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পটুয়াখালীর আরএনপিএল (আরপিসিএল-নরিনকো) ১,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এক মিলিয়ন টন কয়লা আমদানির চুক্তি করা হয় পিটি সাম্বারের সঙ্গে। অভিযোগ উঠেছে, এই চুক্তির পেছনেও রিফাত-ঘনিষ্ঠ চক্র সক্রিয় ছিল।এদিকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভিয়েতনাম সরকারও পিটি সাম্বারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কয়লা সরবরাহের অভিযোগ তোলে এবং এ বিষয়ে ইন্দোনেশিয়া সরকারকে চিঠি দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।রাফে সালমান রিফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক নেতা এবং পরে United International University-এ ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তবে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হলেন—সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাফে সালমান রিফাত দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবেই তাকে সিপিজিসিবিএলের পরিচালক করা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ “উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন”। তার ভাষ্য, “বিশেষ মহলকে সুবিধা না দেয়ার কারণেই এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।”তবে অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে জমা দেয়া চিঠি গ্রহণ ও নথিভুক্ত হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সম্পাদিত সব কয়লা আমদানি চুক্তি পুনরায় তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে আমদানি হওয়া কয়লার মান পরীক্ষা না করলে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎখাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।