1 month ago
36 views

জে-১০সিই যুদ্ধবিমান চুক্তি: বাংলাদেশের আকাশশক্তির নতুন যুগ, উদ্বিগ্ন ভারত

ইনসাইডার ডিস্ক, ২১ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট ক্রয়ের উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ও নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন, যদিও ভারতের নিরাপত্তা মহলে এটি নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এ সংক্রান্ত আলোচনা গতি পায়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। এর ফলে ঢাকা ও বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে এই যুদ্ধবিমানগুলো সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে আধুনিক প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করে আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি পাইলট ও কারিগরি কর্মীদের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, লজিস্টিক সহায়তা এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ করবে চীন। জানা গেছে, চুক্তির অর্থ দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ থাকায় জাতীয় অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক বড় চাপ সৃষ্টি হবে না। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে বিমানগুলো বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বাংলাদেশের এই সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচি ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তকারী শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন কৌশলগত আলোচনায় বাংলাদেশের নতুন যুদ্ধবিমান সক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে। কিছু ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় ঘাঁটিতে আধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এসব মূল্যায়ন মূলত কৌশলগত বিশ্লেষণ ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের মতামত, কোনো আনুষ্ঠানিক সংঘাত পরিস্থিতির ইঙ্গিত নয়।জে-১০সিই: কেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু?জে-১০সিইকে চীনের অন্যতম আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক AESA রাডার, উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ (BVR) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা। বিশেষ করে পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষমতার কারণে বিমানটি আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের কাছেও উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব পেয়েছে।উন্নত ডেটা-লিংক ও নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ ব্যবস্থার মাধ্যমে জে-১০সিই আধুনিক আকাশযুদ্ধে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত অভিযান পরিচালনায় সক্ষম বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন মাত্রাবাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই চীন থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাবমেরিন, ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পর এবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংযোজন দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও গভীর করবে।অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অনেক পর্যবেক্ষক বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অংশ হিসেবেও বিশ্লেষণ করছেন।তবে বাংলাদেশ সরকার ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে দেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। বরং জাতীয় নিরাপত্তা, আকাশসীমা সুরক্ষা এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিই এর প্রধান উদ্দেশ্য।নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার পথে দক্ষিণ এশিয়াবাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক পারস্পরিক নির্ভরতা থাকায় দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং সামরিক আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান সংগ্রহের উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রতিরক্ষা ক্রয় নয়; এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যেখানে প্রতিটি সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.